Farhan Ishrak

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ গেজেট ও মূল বেতন (২০২৬ আপডেট)

সরকারি চাকরিতে যোগদান, পদোন্নতি কিংবা পেনশনের হিসাব—সব জায়গায় ঘুরেফিরে আসে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ (গেজেট ও মূল বেতন) প্রসঙ্গটি। কিন্তু কোন গ্রেডে শুরুর মূল বেতন কত, ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যোগ হয় আর মূল গেজেটটি কোথায় পাওয়া যায়—এ নিয়ে বিভ্রান্তি এখনো অনেক।

এই লেখায় ২০টি গ্রেডের পূর্ণ মূল বেতন তালিকা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হিসাব, বেতন নির্ধারণের ধাপ, দরকারি কাগজপত্র এবং জাতীয় বেতন স্কেল pay scale 2015 pdf ডাউনলোডের নিয়ম ধাপে ধাপে দেওয়া হলো। শেষে সাধারণ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তরও পাবেন।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ আসলে কী

২০১৫ সালের বেতন স্কেল হলো বাংলাদেশ সরকারের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল। এটি জারি হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে, চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫ নামে।

এই আদেশের ভিত্তিতেই সরকারি, আধা-সরকারি ও অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মূল বেতন নির্ধারিত হয়। মূল বেতন কার্যকর ধরা হয়েছে ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে, আর ভাতার বড় অংশ পরবর্তী অর্থবছর থেকে।

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল গেজেট এক নজরে

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ গেজেট পড়ার আগে মূল কয়েকটি তথ্য জেনে রাখা ভালো। এতে পরে নিজের গ্রেড ও ধাপ বুঝতে সুবিধা হয়।

  • আদেশের নাম — চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫
  • জারিকারী — অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ
  • গ্রেড সংখ্যা — ২০টি (গ্রেড ১ সর্বোচ্চ, গ্রেড ২০ সর্বনিম্ন)
  • মূল বেতন কার্যকর — ১ জুলাই ২০১৫ থেকে
  • বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট — মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে
  • বিলুপ্ত — সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল

গেজেটে গ্রেডভিত্তিক ধাপ, বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, ভাতার হার এবং পেনশন-সংক্রান্ত নির্দেশনা আলাদা অনুচ্ছেদে বিস্তারিত বলা আছে।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ ধাপ ও গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন

নিচের টেবিলে প্রতিটি গ্রেডের শুরুর মূল বেতন ও সর্বোচ্চ সীমা দেওয়া হলো। এটিই জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী প্রাপ্য মূল বেতন বিবরণী তৈরির মূল ভিত্তি।

গ্রেডশুরুর মূল বেতন (টাকা)সর্বোচ্চ মূল বেতন (টাকা)
১৭৮,০০০নির্ধারিত
২৬৬,০০০৭৬,৪৯০
৩৫৬,৫০০৭৪,৪০০
৪৫০,০০০৭১,২০০
৫৪৩,০০০৬৯,৮৫০
৬৩৫,৫০০৬৭,০১০
৭২৯,০০০৬৩,৪১০
৮২৩,০০০৫৫,৪৭০
৯২২,০০০৫৩,০৬০
১০১৬,০০০৩৮,৬৪০
১১১২,৫০০৩০,২৩০
১২১১,৩০০২৭,৩০০
১৩১১,০০০২৬,৫৯০
১৪১০,২০০২৪,৬৮০
১৫৯,৭০০২৩,৪৯০
১৬৯,৩০০২২,৪৯০
১৭৯,০০০২১,৮০০
১৮৮,৮০০২১,৩১০
১৯৮,৫০০২০,৫৭০
২০৮,২৫০২০,০১০

ধাপ বা স্টেপ মানে কী

প্রতিটি গ্রেডের ভেতরে কয়েকটি ধাপ থাকে। প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট পেয়ে কর্মচারী এক ধাপ ওপরে ওঠেন এবং গ্রেডের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছালে সেখানেই বেতন থেমে যায়।

গ্রেড ১ ও বিশেষ পদের ব্যতিক্রম

গ্রেড ১-এর বেতন নির্ধারিত, তাই এখানে ধাপ বা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নেই। রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতিসহ কয়েকটি সাংবিধানিক ও বিশেষ পদের জন্য আলাদা বেতনক্রম প্রযোজ্য।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ ইনক্রিমেন্ট কীভাবে হিসাব করবেন

বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ এবং সাধারণত প্রতি বছর ১ জুলাই তারিখে যোগ হয়। নিজের হিসাব মিলাতে এই ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

  1. চলতি মূল বেতনের অঙ্কটি লিখে নিন।
  2. মূল বেতনকে ০.০৫ দিয়ে গুণ করে ৫ শতাংশ বের করুন।
  3. প্রাপ্ত অঙ্কটি নিকটতম ১০ টাকায় রাউন্ড করুন।
  4. চলতি মূল বেতনের সঙ্গে যোগ করে নতুন ধাপ নির্ণয় করুন।
  5. নতুন বেতন গ্রেডের সর্বোচ্চ সীমা ছাড়ালে সীমাতেই আটকে যাবে।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন ১৬তম গ্রেডে আপনার মূল বেতন ৯,৩০০ টাকা। এর ৫ শতাংশ প্রায় ৪৭০ টাকা, তাই ইনক্রিমেন্টের পর মূল বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৯,৭৭০ টাকা।

যাঁরা মাঝপথে নিয়োগ বা পদোন্নতি পেয়েছেন, তাঁদের ইনক্রিমেন্টের তারিখ নির্ধারণে গেজেটের নির্দিষ্ট বিধান ও পরবর্তী স্পষ্টীকরণ প্রজ্ঞাপন দেখে নিতে হয়।

বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন করার ধাপ

২০১৫ স্কেলে বেতন নির্ধারণ এখন মূলত অনলাইনে iBAS++ সিস্টেমের মাধ্যমে হয়। হিসাবরক্ষণ অফিসে যাওয়ার আগে নিচের ধাপগুলো শেষ করে নিলে কাজ দ্রুত হয়।

  1. iBAS++ পে ফিক্সেশন পোর্টালে গিয়ে প্রযোজ্য অপশনটি বেছে নিন।
  2. এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ ও সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন বা লগইন করুন।
  3. পদ, গ্রেড, যোগদানের তারিখ ও আগের বেতনের তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন।
  4. তথ্য যাচাই করে সাবমিট করুন এবং ফিক্সেশন বিবরণী প্রিন্ট নিন।
  5. প্রিন্ট কপি ও কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে যাচাই করান।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা

  • জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
  • নিয়োগ বা পদোন্নতির আদেশের কপি
  • যোগদানপত্র এবং চাকরি বইয়ের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা
  • সর্বশেষ বেতন সনদ বা এলপিসি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
  • আগের বেতন নির্ধারণী বিবরণী, যদি থাকে
  • ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল নম্বরের তথ্য

কাগজপত্রে নাম ও জন্মতারিখের বানান একরকম রাখুন। ছোট অমিলের কারণেও ফিক্সেশন আটকে যেতে পারে এবং সংশোধনে সময় লাগে।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ pdf download করার নিয়ম

মূল গেজেটের নির্ভরযোগ্য কপি পাওয়া যায় অর্থ বিভাগের নিজস্ব ওয়েবসাইটে। জাতীয় বেতন স্কেল pay scale 2015 pdf সংগ্রহ করতে এভাবে এগোতে পারেন।

  1. ব্রাউজারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইট (mof.gov.bd) খুলুন।
  2. আইন ও বিধি, প্রজ্ঞাপন বা ডাউনলোড অংশে যান।
  3. সার্চ বক্সে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫ লিখে খুঁজুন।
  4. ফাইলের পাশে থাকা ডাউনলোড আইকনে ক্লিক করে পিডিএফটি সংরক্ষণ করুন।
  5. একই জায়গা থেকে পরবর্তী সংশোধনী ও স্পষ্টীকরণ প্রজ্ঞাপনগুলোও নামিয়ে নিন।

বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ছড়ানো কপি ব্যবহার করলে পুরোনো বা অসম্পূর্ণ সংস্করণ পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সরকারি সূত্রকেই অগ্রাধিকার দিন।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ এর সংশোধনী ও হালনাগাদ

গেজেট জারির পর অর্থ বিভাগ সময়ে সময়ে সংশোধনী ও ব্যাখ্যামূলক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সাধারণত এসব বিষয় সেখানে স্পষ্ট করা হয়।

  • পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি
  • বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তারিখ নির্ধারণ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা
  • টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বিলোপের পরবর্তী জটিলতা নিরসন
  • নির্দিষ্ট কিছু পদ বা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা নির্দেশনা
  • ভাতার হার ও কার্যকর তারিখ সংক্রান্ত পরিবর্তন

পরবর্তী বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা বা প্রণোদনা ভাতাও দেওয়া হয়েছে। নতুন পে স্কেল কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ২০১৫ সালের স্কেলই হিসাবের ভিত্তি থাকে।

তাই বর্তমান হার নিশ্চিত হতে অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনটি একবার মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। পুরোনো ব্লগ পোস্টের তথ্যের ওপর ভরসা করা ঠিক নয়।

মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত প্রধান ভাতাগুলো

মোট বেতন হিসাব করতে হয় মূল বেতনের সঙ্গে ভাতা যোগ করে। ২০১৫ স্কেলের আওতায় প্রধান ভাতাগুলো নিচে দেওয়া হলো।

  • বাড়ি ভাড়া ভাতা — মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ, এলাকা ও গ্রেড অনুযায়ী ভিন্ন
  • চিকিৎসা ভাতা — মাসিক নির্দিষ্ট হারে
  • উৎসব ভাতা — বছরে দুইবার, প্রতিবার এক মাসের মূল বেতন
  • বাংলা নববর্ষ ভাতা — মূল বেতনের ২০ শতাংশ
  • শ্রান্তি বিনোদন ভাতা — প্রতি তিন বছরে এক মাসের মূল বেতন
  • শিক্ষা সহায়ক, টিফিন, যাতায়াত ও ধোলাই ভাতা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)

ভাতার হার পদ, গ্রেড ও কর্মস্থল অনুযায়ী বদলায়। তাই নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হার হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।

যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

  • গ্রেড আর ধাপকে একই জিনিস ভেবে ফেলা
  • ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশের বদলে নির্দিষ্ট টাকা ধরে নেওয়া
  • সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেও ইনক্রিমেন্ট আশা করা
  • অনির্ভরযোগ্য সূত্রের পিডিএফ দেখে বেতন বিবরণী তৈরি করা

শেষ কথা

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ এখনো সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন নির্ধারণের ভিত্তি। ২০টি গ্রেড, ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং গ্রেডভিত্তিক সর্বোচ্চ সীমা—এই তিনটি বিষয় বুঝলেই নিজের বেতন হিসাব সহজ হয়ে যায়।

নিজের গ্রেড ও ধাপ নিশ্চিত করতে মূল গেজেট এবং সর্বশেষ সংশোধনীর পিডিএফ সংগ্রহে রাখুন। জটিল কোনো ক্ষেত্রে হিসাবরক্ষণ অফিসের পরামর্শ নিলে ফিক্সেশন ও পেনশন হিসাবে ভুলের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ কখন থেকে কার্যকর হয়েছে?

এই স্কেলের মূল বেতন ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়, আর ভাতার বড় অংশ পরবর্তী অর্থবছর থেকে প্রযোজ্য হয়েছে।

২০১৫ সালের বেতন স্কেলে কতটি গ্রেড আছে?

মোট ২০টি গ্রেড আছে। এর মধ্যে গ্রেড ১ সর্বোচ্চ এবং গ্রেড ২০ সর্বনিম্ন ধরা হয়।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ ইনক্রিমেন্ট কত শতাংশ?

বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ, যা সাধারণত প্রতি বছর ১ জুলাই তারিখে যোগ হয়।

জাতীয় বেতন স্কেল pay scale 2015 pdf কোথায় পাওয়া যাবে?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটের প্রজ্ঞাপন বা ডাউনলোড অংশে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫ খুঁজে পিডিএফটি ডাউনলোড করা যায়।

গ্রেড ২০ ও গ্রেড ৯ এ শুরুর মূল বেতন কত?

গ্রেড ২০ এ শুরুর মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা এবং গ্রেড ৯ এ শুরুর মূল বেতন ২২,০০০ টাকা।

সর্বশেষ আপডেট:

Farhan Ishrak
লিখেছেন

Farhan Ishrak

বিভিন্ন ধরণের সরকারি সেবা ঘরে বসে হাতে থাকা মোবাইলের মাধ্যমে কীভাবে নিতে হয়, কোনো খরচ ছাড়াই, সেসব পদ্ধতি শেয়ার করি এই ব্লগে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট ও ভিসা, বিভিন্ন ধরণের ভাতা ও সরকারি সেবা সংক্রান্ত তথ্য পাবেন এখানে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।